
সাভার প্রতিনিধি:
সাভার পৌর এলাকায় নাগরিকদের কাছ থেকে পৌর কর আদায়ে একদিকে বাড়তি চাপ,অন্যদিকে বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান,হাসপাতাল ও শপিংমলের ক্ষেত্রে বিপুল অঙ্কের কর নির্ধারণের পর আপিলের সুযোগে বড় অংশ মওকুফ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এতে পৌরসভার রাজস্ব আদায়ে তৈরি হচ্ছে বড় ধরনের ঘাটতি।প্রশ্ন উঠেছে—কর নির্ধারণ ও আপিল নিষ্পত্তির এই প্রক্রিয়ায় কারা লাভবান হচ্ছেন,আর ক্ষতিটা শেষ পর্যন্ত বহন করছেন পৌরবাসীই।প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী,২০২৫-২৬ অর্থবছরে সাভারপৌরসভার মোট হোল্ডিং সংখ্যা ৩৬ হাজার ২২টি।এসব হোল্ডিং থেকে পৌর কর্তৃপক্ষ ১১ কোটি ৬০ লাখ ৮২ হাজার ১৩২ টাকা হাল দাবি করেছে।কিন্তু আপিলের মাধ্যমে এর বড় একটি অংশ মওকুফ হয়ে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।অভিযোগ রয়েছে,অনেক প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত করের অঙ্কের একটি বড় অংশ আপিলের মাধ্যমে কমিয়ে নিচ্ছে।শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এমন কর ছাড়ের তালিকায় রয়েছে ডাইং অ্যান্ড ফিনিশিং ইন্ডাস্ট্রিজ,কর্ণপাড়া টেক্সটাইল লিঃ.আনলিমা টেক্সটাইল লিঃ.জি.কে.গ্লোবাল বাটন,এইচ আর টেক্সটাইল লিঃ.বেঙ্গল ফাইন সিরামিকস লিঃ.ভিশন অ্যাপারেলস(প্রাঃ)লিঃ.বেস্ট ডেলিম অ্যাপারেল,সইজ কোয়ালিটি পেপার(বিডি)লিঃ.এইচ.আর.ইন্ডাস্ট্রিজ লি.ফ্যাশন কম্প্যাক্ট অ্যাকসেসরিজ লিঃ.ও সুরমা গার্মেন্টসসহ আরও বহু প্রতিষ্ঠান।শুধু শিল্পকারখানা নয়, কর নির্ধারণ ও আপিলের এই প্রক্রিয়ার আওতায় এসেছে সাভারের গুরুত্বপূর্ণ শপিংমল গুলোও।এর মধ্যে রয়েছে উৎসব প্লাজা,ইউসুফ টাওয়ার,আর.এস.টাওয়ার,ভরসা মার্কেট,মডার্ন প্লাজা, মনসুর মার্কেট,চৌরঙ্গী মার্কেট, মাহতাব প্লাজা,সাভার নিউমার্কেট,দিলখুশা সুপার মার্কেট ও জাতীয় অন্ধ মার্কেট সংস্থাসহ আরও অনেক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান।হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার গুলোর ক্ষেত্রেও একই ধরনের চিত্র পাওয়া গেছে বলে অভিযোগ।তালিকায় রয়েছে সাভার সুপার হসপিটাল প্রাঃ লিঃ,ল্যাবএইড ফার্মাসিউটিক্যালস লিঃ,প্রাইম হাসপাতাল ,এনাম মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতাল,আব্বাস হাসপাতাল,ল্যাবএইড ডায়াগনস্টিক ও সাভার জেনারেল হাসপাতালসহ অন্তত ৫০টি হাসপাতাল ও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান।অভিযোগ রয়েছে,আপিলের মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠানও নির্ধারিত পৌর করের বড় অংশ কমিয়ে নিয়েছে।এ অভিযোগের বিষয়ে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর একটি অংশের দাবি,তারা কর ফাঁকি দিচ্ছে না;বরং পৌরসভার নির্ধারিত করের সঙ্গে বাস্তবে পাওয়া নাগরিক সেবার সামঞ্জস্য নেই।পাকিজা গ্রুপের প্রশাসন মহাব্যবস্থাপক (জিএম)এস এম মহিদুল ইসলাম বলেন,মাত্র ১৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা কর পরিশোধ কেন করলাম—এ প্রশ্নের আগে প্রশ্ন থাকা উচিত,দেড় কোটি টাকার মধ্যে ১৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা আদায়ের পর পৌর কর্তৃপক্ষ কেন সন্তুষ্ট?এছাড়াও আমরা পৌরসভার বিভিন্ন প্রোগ্রামে চাহিদা অনুযায়ী টাকা দিই। আবার পৌর এলাকার ছোট ছোট রাস্তা সংস্কারের জন্য টাকা,ইট,বালু,খোয়া দিয়ে পৌর কর্তৃপক্ষকে সহযোগিতা করে থাকি।পাশাপাশি পৌর এলাকার ময়লা অপসারণের জন্য যানবাহনের ব্যবস্থা করে দিয়েছি।তিনি আরও বলেন,আমরা কর ফাঁকি দিই না।পর্যাপ্ত কর পরিশোধের পরও আমরা পৌরসভার পূর্ণাঙ্গ সুবিধা পাচ্ছি না।আমরা যখন তাদের জিজ্ঞেস করি,এত টাকা কর নির্ধারণ করেছেন কীভাবে,তখন তাদের জবাব এবং নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়,পৌর করের মধ্যে ময়লা অপসারণের জন্য একটি পার্সেন্টেজ ধরা রয়েছে।পৌর কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তাদের কারখানার ময়লা নিয়মিত অপসারণ করা হয় না।ফলে প্রতিষ্ঠানটিকে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বর্জ্য অপসারণ করতে হয়।এদিকে সাভার পৌর এলাকায় রয়েছে বিপুল সংখ্যক শিল্পকারখানা ,হাসপাতাল,শপিংমল,আবাসিক ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান।এসব প্রতিষ্ঠান পৌরসভার সড়ক,ড্রেনেজ,সড়কবাতি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন নাগরিক সুবিধা ব্যবহার করে থাকে।কিন্তু বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে কর নির্ধারণের পর আপিলের মাধ্যমে বিপুল অঙ্ক কমে গেলে পৌরসভার রাজস্ব আয় কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে—এ প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে।অন্যদিকে পৌরবাসীর অভিযোগ,নিয়মিত পৌর কর পরিশোধ করেও অনেক এলাকায় কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়া যায় না।কোথাও সড়কের বেহাল দশা,কোথাও ড্রেনেজ সমস্যা,আবার এমনকি কোথাও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় দেখা যায় দুরবস্থা।ফলে পৌরসভার আয় কমে গেলে এসব সেবা আরও সংকটে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করেন পৌরবাসী।এদিকে সরেজমিনে তথ্যসূত্রের অনুসন্ধানে উঠে আসা তথ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে—কর নির্ধারণের পর আপিলের মাধ্যমে কত টাকা কমানো হয়েছে এবং কোন কোন প্রতিষ্ঠান কত টাকা ছাড় পেয়েছে।একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর বিপুল পরিমাণ কর ধার্য করার পর আপিল শুনানিতে যদি তার বড় অংশ মওকুফ করা হয়,তাহলে প্রথমেই প্রশ্ন আসে—প্রাথমিক ভাবে কর নির্ধারণের ভিত্তি কী ছিল?আবার আপিলের পর কর কমিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রেই বা কী ধরনের নথি, মূল্যায়ন ও বিধিমালা অনুসরণ করা হয়েছে?এ বিষয়ে স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ না হলে কর নির্ধারণ ও আপিল নিষ্পত্তির পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে।
পাশাপাশি রাজস্ব হারালে ক্ষতির হবে পৌরসভারই।সাভার একটি দ্রুত বর্ধনশীল শিল্প ও বাণিজ্যিক এলাকা। এখানে শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্যিক স্থাপনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পৌরসভার নাগরিক সেবার ওপরও চাপ বাড়ছে।ফলে পৌরসভার নিজস্ব রাজস্ব আয় বাড়ানো জরুরি।কিন্তু নির্ধারিত করের বড় অংশ যদি আপিলের মাধ্যমে বাদ পড়ে, তাহলে একদিকে পৌরসভার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত হবে,অন্যদিকে নাগরিক সেবা উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংকট তৈরি হতে পারে।তবে সংশ্লিষ্টদের মতে,কর নির্ধারণ, আপিল,ছাড় এবং আদায়ের পুরো প্রক্রিয়া ডিজিটাল ও স্বচ্ছ করা দরকার। কোন প্রতিষ্ঠানের ওপর কত টাকা কর ধার্য হয়েছে,কত টাকা আদায় হয়েছে এবং আপিলে কত টাকা কমানো হয়েছে—এসব তথ্য প্রকাশ করা হলে অনিয়মের সুযোগ কমবে এবং পৌরসভার রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি বাড়বে।তবে সাধারণ জনগণের মাঝে প্রশ্ন একটাই—৩৬ হাজার ২২টি হোল্ডিং থেকে নির্ধারিত ১১ কোটি ৬০ লাখ ৮২ হাজার ১৩২ টাকার মধ্যে শেষ পর্যন্ত কত টাকা পৌরসভার কোষাগারে জমা পড়েছে,আর আপিলের নামে কত টাকা কমানো হয়েছে?এই হিসাবই বলে দেবে সাভার পৌরসভার কর ব্যবস্থাপনায় আসলে কত বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
চলবে,,,,,,,,,,।

সাভার প্রতিনিধি। 











